সে এক সময়ের কথা তখন মানুষের হাতে এখনকার
মত হাতে টাকা-পয়সা ছিল না, কিন্তু মানুষের মধ্যে এক অনাবিল আনান্দ ছিল। সুখ ছিল প্রানে।
হাতে Android ফোন ছিল না। মানুষ এত স্মার্ট ছিল না। কিন্তু সবার মধ্যে এক অটুট বন্ধন
ছিল। মানুষে মানুষে এক নিবির ভালোবাসা ছিল। মানুষ মানুষকে নিজের মত করে কাছে টেনে নিতে
জানত। আসলে আমরা যত উন্নত হচ্ছি ততই আমরা মানুষের সাথে মিশতে ভুলে জাচ্ছি। Technology
আমাদের উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিলেও মানবতার উচ্চ শিখর থেকে একবারে নিচে পরে গেছি আমরা।
তারই কিছু কথা আজ তোমাদের সাথে ভাগ করে নিঃ-
খুব মনে পরে সেই বাচ্ছা বেলার কথা। তখন আমাদের বাবা-জেঠাদের কাছে
এত টাকা পয়সা ছিল না। কিন্তু সবাই একসাথে থাকা, একসাথে সব সময় সব পরিস্থিতিতে একে অপরের
পাসে দাঁড়ানো; এই সব দেখে বাচ্ছা বেলা কেটেছে। আমার এখনও মনে পরে আমাদের বাড়িতে গ্রামের
প্রায় সবাই আসত, সবাই একসাথে সে কত গল্প, আড্ডা। তখন মানুষদের ভাল ভাবে আপ্যায়ন করতে
পারত না আমার মা, ঠাকুমারা। কারন সেই সময় অত পয়সা ছিল না যে ভাল কিছু খাওয়া-দাওয়া হবে।
কিন্তু একটা অপূরণীয় ভালোবাসা ছিল। আর সেই ভালোবাসার টানে সবাই আসত। কত গল্প হত, হাসি-ঠাট্টা,
মজা। তখন আমি খুব ছোট্ট তাই বড়দের মাঝে বসে সবার গল্প শুনতাম। আর সবাই আদর করে কোলে
টেনে নিত। সে ভালোবাসা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তারপর একটু বড় হলাম, স্কুলে জেতে শিখলাম। আমার খুব মনে পরে, প্রথম
দিন আমি স্কুল যেতে খুব কেঁদেছিলাম। তারপরও মা জোর করে স্কুলে দিয়ে এসেছিল। যাইহোক
স্কুল জীবন শুরু হল। আমাদের সময় থেকেই স্কুলে Mid-Day-Meal চালু ছিল। টিফিন হত ১ টার
সময়। আর সেই টিফিন-এর ঘণ্টা পরার সাথে সাথেই ছুটে গিয়ে বড় করে পা দিয়ে প্রিয় বন্ধুদের
জন্য জায়গা ধরতাম। তারপর সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করা। তারপর শুরু হত আমাদের খেলা,
কোনদিন চোর-পুলিশ বা কোনদিন ধরা-ধরি। অনেক দিন এমন হয়েছে টিফিন শেষ হয়ে ক্লাস শুরু
হয়ে গেছে, আমরা তখনও খেলছি। খেলা শেষ করে যখন স্কুলে গেছি দিদিমনি (তখন আমাদের সময়ে
আমরা Medam-কে দিদিমনি বলতাম) আমাদের খুব বকাবকি করে খুব মার দিল। আবার কখনও কখনও কান
ধরে বাইরে দাড় করিয়ে দিত। কিন্তু কোনোদিন দিদিমনি বা মাস্টার-মশায় দের প্রতি শ্রদ্ধা
ভক্তি কোন দিন কম হয় নি। এখনও আমরা সেই পুরন শিক্ষক শিক্ষিকাদের দেখলে ছুটে গিয়ে প্রনাম
করি আর শুরু হয় অনেক গল্প।
সেই সময়ে এখনকার বাচ্ছাদের মত বায়না করলেই ব্যাট বল পেতাম না।
তাই বাঁশ কেটে ইউকেট তৈরি করা, কখনও তাল গাছের ডাল কেটে ব্যাট তৈরি করা বা কোনো কাঠ
পেলে সেটা কেটে ব্যাট তৈরি করে খেলা হত। আর বল হিসাবে ছিল প্লাস্টিক এর বল। কখনও ফুটবল
বা ভলিবল খেলার ইচ্ছে হলে পলিথিন দিয়ে বল তৈরি করে খেলা। সেই আনান্দ আলাদাই ছিল যার
স্বাদ এখনকার Pub-G, FreeFire খেলা ছেলেপুলেগুল কখনই পাবে না। এখনও সবুজ মাঠটা পরে
আছে কিন্তু মাঠে খেলার মত ছেলে পুলে নেই। এখন ব্যাট বল কেনার যথার্থ পয়সা আছে কিন্তু
খেলার সঙ্গিগুলো আজ নেই। বাচ্ছারা সবাই Mobile Game খেলতে ব্যস্ত। তাই ফাঁকা সবুজ মাঠটা
আজ হাতছানি দিয়ে ডাকে। “চেয়ে দেখ খোকা-খুকির দল সবুজ মাঠ আজ তোদের অপেক্ষায়”।
তারপর বন্ধুদের সাথে হাসি, ঠাট্টা, মজা, মারামারি কত কি। তারপর
আস্তে আস্তে একটু বয়স বাড়ে, বোধ বুদ্ধি একটু জাগ্রত হয়। কারও কারও প্রেম শুরু হয়। কেউ
কেউ আবার কাওকে ভালো লাগলেও ভয়ে মুখ ফুটে বলার সাহস পায় না যদি বন্ধুত্ব ভেঙ্গে জায়।
তবু সেই সময়ে ভালোবাসা ছাড়া আর কোন কথা মাথায় আসত না। একসাথে কিছু সময় কাটানো। এই ভেবে
ভেবে চলে আসে মাধ্যমিক পরিক্ষা জীবনের প্রথম আর সব থেকে বড় পরিক্ষা। পরিক্ষা শেষ হবার
সাথে সাথে কেউ কেউ অন্য স্কুলে চলে যায়। অনেক বন্ধুত্ব এখানেই শেষ হয়ে যায়। আবার অনেক
বন্ধুত্ব এখান থেকেই শুরু হয়।
তারপর নিজের নিজের জীবন গঠনের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ পছন্দের দিকে
পা বাড়ানো। কেউ নরমাল কলেজ, কেও Technical ইত্যাদি। আবারও অনেক বন্ধুত্ব শেষ হয় আবার
নতুন বন্ধুত্ব শুরু হয়।
দুর্গা পূজা কিছু দিন আগেই শেষ হল। আমাদের সময় মনে পরে তখন এত
থিমের পূজো ছিল না, ছিল বাড়ির দুর্গা ঠাকুরগুলো। ঠাকুর তৈরির প্রথম দিন থেকেই ঠাকুর
মণ্ডপে পরে থাকা। পুজোর ৪ টে দিন বন্ধুদের সাথে সারাদিন ছুটো-ছুটি করা, খেলা। সেই মজা
আনন্দ এখন ম্লান। দশমীর দিন সন্ধ্যাবেলা থেকে গ্রামের গুরুজনদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে বিজয়ার
প্রনাম করা আর নাড়ু খাওয়া। তার যে আনান্দ ছিল তা লাখো টাকা দিলেও পাওয়া যাবে না।
এখন কার মত DJ Sound তখন ছিল না। দোলের দিন বড়রা হরিনাম নিয়ে
বের হত। সবাই একসাথে হরিনাম করতে করতে দোল খেলার আস্বাদন আলাদাই।
দুপুরে সব বন্ধুরা মিলে পুকুরে গিয়ে সাঁতার কাটা, স্নান করা এসব
ইতিহাস হয়ে রয়ে যাবে মনের মনি কোঠায়।
দুপুর বেলায় খাবার পর দাদু ঠাকুমার কাছে গিয়ে বিভিন্ন গল্প শোনার
মজাটা আজও বড্ড কস্ট দেয়।
সন্ধার সময় ঠাকুমার মুখে রাম-রাবনের যুদ্ধের কথা শোনার মজাই আলাদা
ছিল। মহাভারত এর গল্প এই সব শুনে আমাদের সময় কেটেছে।
এখন আমরা Upgrade। আমাদের প্রায় সবার কাছেই Smart Phone আছে।
বাচ্ছারা সারা দিন Mobile Game খেলা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে থাকলেও সবাই মোবাইল ফোনে ব্যস্ত।
সবাই মোবাইলে নিজের নিজের মত করে ব্যস্ত আছে। ফেসবুকে আমাদের ৫০০০ বন্ধু। ফটো পোস্ট
করলে কত কত কমেন্ট, লইক। এখন আমরা লইক কমেন্ট গুনি, ফেসবুকে কত বন্ধু আছে গুনি। কিন্তু
কোন দুর্ঘটনা ঘটলে কাঁধে করে তুলে হসপিটালে নিয়ে যাবার মত বন্ধুর খুব অভাব। আমাদের
কাছের বন্ধুগুলোর সাথে গল্প করা বাদ দিয়ে নতুন নতুন বন্ধু বানাচ্ছি ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে,
হোয়াটসআপে। কিন্তু জরিয়ে ধরে মনের কথা বলার বন্ধুর বড্ড অভাব আজ।
আমরা প্রতি নিয়ত Upgrade হচ্ছি, কিন্তু নিজেদের আনান্দ ভুলে জাচ্ছি।
যতই 4G, 5G আসুক না কেন এই সব আনন্দের কাছে সব কিছু তুচ্ছ। আমরা Technically
Upgrade হতে গিয়ে আনন্দ, মজা ভুলে গেছি। আমরা আমাদের নিজেদের থেকেই অনেক দূরে চলে গেছি।
আমাদের না আছে পরবর্তী প্রজন্মের দিকে খেয়াল। না আছে প্রকৃতির দিকে খেয়াল। 4G, 5G করে
অনেক পাখি আজ বিলুপ্ত প্রায়। আগে বাড়ির চালে চড়াই পাখি খুব দেখা যেত, কিন্তু আজ সেই
চড়াই পাখি আর দেখাই যায় না। আগে প্রত্যেকটা তাল গাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কত
নিপুণতার সাথে বানান সেই বাসা, হাজার ঝর জলেও সেই বাসা ভাঙত না। আজ সেই বাবুই পাখি
ও পাখির বাসা বিলুপ্ত।
এত কিছুর পরও প্রকৃতি আমাদের প্রতি নিয়ত আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস
দিয়ে যাচ্ছে। কারন প্রকৃতিও বিশ্বাস করে “একদিন ঝড় থেমে যাবে পৃথিবী আবার শান্ত হবে”।
এই আশা নিয়ে আমাদের দিন চলা। সব কিছু আবার আগের মত হোক।
✍প্রতাপ
এই রকম গল্প, হাসির নাটক আর পড়ার জন্য এখুনি এই ওয়েবসাইটটি Follow
করে নিন। আর এই গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো সেটি কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।

দারুন
ردحذفإرسال تعليق