মর্তের বন্ধুত্ব যমালয়ে জয়! ছোটদের হাসির নাটক।
মঞ্চে অনুষ্ঠিত চরিত্র গুলি হলঃ-
সাহেব, রাকেশ, যশ, শীলা, রোহান, বিক্রম এগারো থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের একদল বন্ধু।
বিক্রম - দলে জনপ্রিয়, ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন।
যমরাজ, যমদূত, প্রহরী
যমরাজ - মৃত্যুর দেবতা। এখানে তাকে দেখানো হয়েছে মজার চরিত্র হিসেবে যিনি কার্টুন দেখতে পছন্দ করেন।
যমদূত - যমরাজের বার্তাবাহক। যমরাজ তাকে আদেশ দিয়েছেন। বিক্রমকে তার কাছে নিয়ে আসতে।
প্রহরী - যমরাজের প্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, পাহারা দেন।
যমরাজ ও যমদূতের পরিচ্ছদের নকশা
সেটিং তৈরির জন্য কাগজ, খবরের কাগজ, থার্মাকোল এবং স্কুলে সহজলভ্য অন্যান্য জিনিস ব্যবহার করো। তিন ধরনের সেটিংয়ে এই নাটকটি অভিনীত হয়ঃ- ১. বাগান যেখানে চরিত্রদের মধ্যে প্রথম দেখা হয়, ২. ঘরের ভেতর, এবং ৩. যমরাজের দরবার। তিনটি চরিত্রের জন্য বিশেষ পোশাক দরকার। মাথার মুকুট ও অলংকার দিয়ে তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। গলায় পুঁতির মালা এবং মাথায় কাগজের মুকুট থাকতে পারে।
দৃশ্য ১
(পর্দা ওঠার পর মঞ্চে কয়েকজন ছেলেমেয়ে দেখা যাবে, বাগানের পটভূমিতে। তারা কোনকিছু নিয়ে আলোচনা করছে।)
সাহেব: এই, বিক্রমের ব্যাপারে কিছু শুনেছো নাকি? মনে হয় তার ম্যালেরিয়া হয়েছে। তার জ্বর যে বেশি হবে এতে আর আশ্চর্যের কী!
রাকেশ: হ্যা শুনেছি। গতকাল তার মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন সঠিক ঔষধ দিয়ে অবশেষে তার চিকিৎসা চলছে।
শীলা: আহা রে হতভাগা! এখন সে পরীক্ষা দেবে কিভাবে?
যশ: বোকা মেয়ে, সে হতভাগা নয়। বরং সে সৌভাগ্যবান যে তাকে পরীক্ষা দিতে হবে না। আমার তো ঈর্ষা হচ্ছে। পড়াশোনা নেই, দুশ্চিন্তা নেই, মায়ের শাসন নেই। শুয়ে শুয়ে কেবল ভালো হওয়ার প্রতীক্ষা করছে। মন্দ কপাল আমার। (সাহেবর কাছে গিয়ে) আমাকে দেখো, সারাদিন শুধু পড়া আর পড়া।
সাহেব: (হাসে) স্বাভাবিক তোমাকে তো সারাদিন পড়তেই হবে। নইলে পাশ করবে কিভাবে, হাঁদা?
যশ: আমাকে বিরক্ত করা ছাড়া কি তোমার আর কোনো কাজ নেই? দাঁড়াও, সেদিন তুমি কী করেছিলে দলের সবাইকে বলে দেবো! জানো তো, সে... (সাহেব তাকে থামিয়ে দেয়)।
সাহেব: শ! শ! আর যদি একটা কথা বলো, তোমাকে আমি...
রোহান: নাহ! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। তোমরা দুজন কি কখনোই ঝগড়া থামাবে না?
যশ: ওকে বলো। সে খুব...খুব...খুব বিরক্তিকর! লেখাপড়ায় ভালো বলে সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে।
সাহেব: আমার দোষ! হা! যশ আগে ঝগড়া শুরু করে, আমি না।
রোহান: তোমরা দুজনেই থামো। তোমরা শিশুরও অধম। তাড়াতাড়ি করো। মনে নেই, বিক্রমকে দেখতে যেতে হবে?
(যশ এবং সাহেব একে অপরকে ভেংচি কাটে। মঞ্চের এক পাশ থেকে সরে সকলে অন্য পাশে আসে।)
দৃশ্য ২
(বিক্রমের ঘর। ছেলেমেয়েরা শুনতে পায়, বিক্রম কোনো এক অপরিচিত কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলছে। তারা ঘরে ঢুকে দেখে বিক্রম একজনের সঙ্গে কথা বলছে। লোকটির গায়ে অদ্ভুত পোশাক, মনে হয়। পৌরাণিক চরিত্র। সে যমদূত, যমরাজের বার্তাবাহক)।
যমদূত: (যমদূত বিছানায় শায়িত বিক্রমের সঙ্গে কথা বলছে) আসো বাপু। আমি যমদূত, তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে। (পকেট থেকে কিছু একটা বের করে) দেখো এতে লেখা আছে, তোমার সময় শেষ। অতএব এখন পৃথিবীকে বিদায় জানাও এবং আমার সঙ্গে আমার জগতে আসো।
বিক্রম: (হতচকিত) আমার সঙ্গে আমার জগতে আসো বলতে কী বোঝাচ্ছো? তোমাকে কে পাঠিয়েছে শুনি? (কাগজের দিকে ইঙ্গিত করে) ওটা কি?
(বিক্ৰম কাগজটা দেখার চেষ্টা করে। যমদূত বিক্রমকে বিছানা থেকে টেনে নামানোর চেষ্টা করে। দৃষ্টি তার ঘড়ির দিকে। ছেলেমেয়েরা কাণ্ড দেখছে আর ভাবছে, হচ্ছেটা কী!)
বিক্রম: হেই, কী করছো? আমাকে কেনো তুলে নিতে চাচ্ছো? শোনো...
যমদূত: আমি যমদূত, যমরাজের বার্তাবাহক। তোমার কথা আমাকে শুনতে হবে না। আমি কেবল আমার ওস্তাদের কথা শুনি। বুঝেছো? আসো, উঠে পড়ো! (তার কাগজের দিকে তাকায়) আমাদের যেতে হবে। তোমাকে যমরাজের হাতে তুলে দেওয়ার পর দিল্লিতে আমার আরেকটি কাজ আছে। বুঝতেই পারছো, আমরা যমদূতেরা আজকাল খুব ব্যস্ত। (বিক্রমের খুব কাছে যায়) তোমাকে একটা কথা বলি। আমি ওভারটাইম কাজ করতে পছন্দ করি, এর জন্য পাওনা ভালো। কিন্তু যথেষ্ট হয়েছে। আমাদের এখন যেতে হবে, বাচ্চু। বেশি ওভারটাইমও ভালো নয়। (সে বিক্রমকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে ছেলেমেয়েরা সিদ্ধান্ত নেয় এবার কাজে নামতে হবে) (ছেলেদের ঘরে প্রবেশ)
সাহেব: (গম্ভীর ভাব নিয়ে যমদূতের চারপাশে হাঁটে) তাহলে তুমি নিজেকে বলছো যমদূত। তুমি বিক্রমকে কোথায় নিয়ে যেতে চাও? (যমদূত বিক্রমের হাত চেপে ধরে আছে)
বিক্রম: (চোখে মুখে বিস্ময়) তোমরা সকলে এসেছো!
রাকেশ: এই! এখন কেমন লাগছে, বিক্রম?
বিক্রম: ভালো, অনেক ভালো। কিছু মনে করো না। আমার অতিথির সঙ্গে পরিচিত হও। সে নিজেকে বলে যমদূত। (যমদূত কটমট করে তাকায়) সে বলছে, যমরাজ তাকে আদেশ করেছে আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে।
রাকেশ: সে তোমাকে নিয়ে যাবে? কোথায়? (ওপরে তাকায়)
শীলা: বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
রোহান: তোমার সঙ্গে কাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছো? তাকে? (বিক্রমের দিকে আঙুল তুলে দেখায়) আমাদের অনুমতি ছাড়া? তোমার সাহস তো কম নয়!
যশ: (যমদূতের কাঁধে হাত রেখে) শোনো যমভাইয়া। এ হলো বিক্রম, আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু এবং আমাদের দলপতি।
শীলা: (যশকে একপাশে সরিয়ে) এবং আমাদের ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেনও বটে।
সাহেব: এটা মেনে নেওয়া যায় না। রীতিমতো দাদাগিরি হচ্ছে!
রোহান: এটা দাদাগিরি নয়, যমগিরি।
(এর মধ্যে যমদূত বেশ বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সে তার গোঁফে আঙুল বোলাচ্ছে। সে ভালো করে জানে বিক্রমকে যমদূতের কাছে নিয়ে যেতে না পারলে মহাবিপদ। ব্যাপারটা ভয়াবহ। সে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।)
যশ: যমভাই, তুমি কিছু করতে পারবে না। বিক্রমকে তোমার সঙ্গে নিতে পারবে না, এটাই শেষ কথা। (সে বিক্রমকে তার দিকে টান দেয়, যমদূতও তার দিকে টান দেয়।)
যমদূত: আমি অত্যন্ত বিভ্রান্ত।
রাকেশ: তা তো দেখতেই পাচ্ছি। (হাসে) যাহোক, একটা জিনিস নিশ্চিত। বিক্রম কোথাও যাচ্ছে না। পরিষ্কার?
রোহান: তুমি এভাবে তাকে নিয়ে যাবে তা কি হয়?
যশ: তোমার একটু বুদ্ধিসুদ্ধি থাকা দরকার। (যমদূত তার মাথায় হাত রাখে। সে রাগান্বিত)
যমদূত: হায় ভগবান! (তার ভুল বুঝতে পারে) যমরাজ আমি এখন কী। করবো? এই বাচ্চাগুলো কেন বুঝতে পারছে না যে বিক্রমকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আসো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। (তাকে ধরে টান দেয়। রোহান ঢালের মতো তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। যমদূতকে ধরে।)
যমদূত: (মেজাজ খারাপ) তোমাকে নিয়ে আমি এখন কী করবো?
রোহান: তোমার যা ইচ্ছা করো। আমি তোমার।
যশ: (হাসে) হা, বন্ধুবর, রাকেশ তোমাকে কী বলেছে?
যমদূত: আমাকে?
যশ: হ্যাঁ তোমাকে।
রোহান: আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে এটা একবিংশ শতাব্দী এবং এটা ভারত।
শীলা: এবং ম্যালেরিয়া এখানে আর প্রাণঘাতী রোগ নয়।
রোহান: তাছাড়া, ম্যালেরিয়া সারানোর ঔষধ আছে। বিক্রম সেটা খাচ্ছে।
শীলা: তার সুস্থ হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। এই যে দেখো তার ঔষধ। (যমদূতকে ঔষধের দিকে টান দেয়। সে শঙ্কিত।)
বিক্রম: হ্যাঁ, এই যে দেখো আমার খাবার বড়ি। আর আমার জ্বর প্রায় সেরে গেছে।
সাহেব: ঠিক। সে কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবে। (ভুলে যমদূতের পা মাড়িয়ে দেয়)
যমদূত: উহহহ...
শীলা: যাহোক,এখন তো বুঝতে পারছো, ভারতে ম্যালেরিয়া একটি নিরাময়যোগ্য রোগ। কাজেই তুমি তাকে কেন নিয়ে যাবে?
রাকেশ: যাও অন্য কোনো লক্ষ্য ঠিক করো।
যমদূত: হু! বিক্রম কিভাবে ভালো হবে? (কাগজটি বের করে) মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ দেখো। এটা এখনই। তোমাদের বোকামি থামাও। (ছেলেমেয়েদের সরিয়ে দেয়) আমি তাকে নিয়ে যাবো। তাকে মরতে হবে।
(ছেলেমেয়েরা যমদূতকে মারতে শুরু করে)
যশ: কাউকে যদি মরতেই হয়, তবে সেটা তুমি, বিক্রম নয়। (বিক্রমের দিকে ইঙ্গিত করে)
যমদূত: হা ঈশ্বর... দয়া করে মারপিট থামাও। তোমাদের হাতগুলো কি। লোহা দিয়ে তৈরি? আরে থামো... মারা যাচ্ছি তো!
যশ: সামনে যা আছে এটা তার নমুনামাত্র। দেখতে চাও তোমার জন্য আরো কী মার জমা আছে?
যমদূত: না, না! (করুণ কণ্ঠে)
রোহান: (যমদূতকে ধরে) ঠিক আছে। কিন্তু একটা শর্তে। বিক্রম কোথাও যাবে না। নইলে... (হাত তোলে)
যমদূত: দাড়াও থামো। এটা সম্ভব নয়। তাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। যদি আমি তাকে যমরাজের দরবারে হাজির না করি, আমার চাকরি যাবে। তখন আমার সংসার কিভাবে চলবে? জিনিসপত্রের যা দাম বেড়েছে...
শীলা: তোমার চাকরির নিকুচি করি!
সাহেব: আচ্ছা। তুমি যদি বিক্রমকে নিয়েই যেতে চাও, তবে নিয়ে যাও।
যমদূত: সত্যি? (তার চোখ জ্বলজ্বল করে)।
রাকেশ: হ্যাঁ, তবে একটি শর্তে। যদি তুমি তাকে নিয়ে যেতে চাও, তবে আমাদের সবাইকে নিয়ে যেতে হবে...
শীলা: ...কারণ আমরা যমরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই।
রাকেশ: হ্যাঁ, আমরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। বিক্রমের ম্যালেরিয়া হয়েছে বলে তাকে নিয়ে যেতে হবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সে কে?
(তারা সকলে যমদূতকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকে। এতক্ষণে যমদূতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে বুঝে গেছে তার অন্য কোনো গতি নেই।)
কোরাস: ধাপ্পাবাজ নিপাত যাক! নিপাত যাক, নিপাত যাক!
যমদূত: আস্তে আস্তে! চলো, সবাই চলো! কিন্তু দয়া করে আমাকে আর মেরো না। দেখো আমার গাল কেমন লাল হয়ে গেছে! যমরাজই ঠিক করুক, এরপর কী করতে হবে। চলো যাই। (সকলে মঞ্চ থেকে প্রস্থান করে)
দৃশ্য ৩
(তারা যমরাজের দরবারে প্রবেশ করে। তারা অবিরাম চিৎকার চেঁচামেচি করছে। সামনে একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে।)
প্রহরী: হই (যমদূতকে দেখে) আহ যমদূত মশায়, আপনি কেন এত বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এসেছেন? (রেজিস্টার খাতার দিকে তাকায়) তোমার একটি বাচ্চা আনার কথা ছিল, কিন্তু তুমি মনে হয় পুরো ক্রিকেট দল নিয়ে এসেছো। তোমার গণিতের জ্ঞান সর্বদা একটু কম। (প্রহরী মুচকি হাসে)
যমদূত: হা ঈশ্বর! এদিকে আমি মারা যাচ্ছি, আর সে আমাকে নিয়ে টিটকারি করছে! তুমি কি মনে করো আমি আহাম্মক? (প্রহরীর দিকে তাকিয়ে) দেখতে পাচ্ছো না? আমার দিকে তাকাও! আমার পোশাকের দিকে তাকাও! গালের দিকে তাকাও! কেমন লাল হয়েছে। শরীর ব্যথা করছে। যত্তো সব!
(ছেলেমেয়েরা অস্থির হয়ে উঠছে। তারা যমরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আঁকুপাকু করছে। রোহান শক্ত করে বিক্রমের হাত ধরে আছে।)
যমদূত: এই বাচ্চাগুলো আমার কথায় কান দেয়নি। তারা গোঁ ধরেছে, যদি বিক্রমকে নিয়ে আসি, তবে তারাও সঙ্গে আসবে। বারণ করাতে তারা আমাকে থাপ্পর মেরেছে। আমার গালদুটো দেখো।
রোহান: স্বাভাবিক! বিক্রমের ম্যালেরিয়া হয়েছে এবং সে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। যমরাজ কারণ ছাড়া বিক্রমকে তুলে নেওয়ার কে?
প্রহরী: (এখন তাকেও শঙ্কিত দেখায়) ইশ! এতো জোরে কথা বলো না। যমরাজ শুনলে তখন কী হবে? তার সম্পর্কে এভাবে কথা বলার সাহস কারো নেই।
রাকেশ: আমাদেরকে কি ঢুকতে দেবে, নাকি আমরাই...? (তারা প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, এমন সময় ভেতর থেকে যমরাজের কণ্ঠ শোনা যায়।)
যমরাজ: বড্ড কোলাহল! কী হয়েছে? কার এতো সাহস আমাকে বিরক্ত করে! আমার রাজ্যে সকলে জানে এ সময় আমি কার্টন নেটওয়ার্ক দেখি। এ সময় কেউ আমাকে বিরক্ত করে না। উহ, কী আওয়াজ! আমি আওয়াজ অপছন্দ করি। ওদেরকে ভেতরে পাঠাও। আমার রাজ্যে ‘যমরাজের পতন হোক!’ তাও আমার বাড়ির মধ্যে? ওদের এতো সাহস!
(ছেলেমেয়েরা প্রহরীকে ধাক্কা মেরে যমরাজের ঘরে প্রবেশ করে)
দৃশ্য ৪
প্রহরী: (ছেলেমেয়েদেরকে) দেখো তোমরা কী করেছো! যমরাজ রেগে গেছে। (একটু ভয় পেয়ে) দুঃখিত মহারাজ, এখানে কতোগুলো ছেলেমেয়ে এসেছে। তারা বলছে তারা ভারত থেকে এসেছে।
যমরাজ: ভারত থেকে কতগুলো ছেলেমেয়ে এসেছে! যমদূত কোথায়? আমি তো কেবল বিক্রম নামে একটি বালককে আনতে বলেছিলাম। যমদূত কি তাকে এনেছে নাকি আনে নাই?
যমদূত: হ্যাঁ মহারাজ, আমি তাকে নিয়ে এসেছি। কিন্তু তার বন্ধুরাও তার সঙ্গে আসার গোঁ ধরেছে। তারা আমার কথা শুনতেই চাইলো না, মহারাজ। তারা জোর করেছে এবং আমি মানা করায় আমাকে মারধর করেছে। আমার গালদুটো দেখুন, কেমন লাল হয়ে গেছে।
(ছেলেমেয়েরা অস্থির। তারা চিৎকার করছে। যমরাজের পতন হোক, পতন হোক, পতন হোক! মানছি না, মানব না)
শীলা: এএএ... যমরাজ! আসল যমরাজ! বাড়ি গিয়ে সবাইকে বলতে হবে।
রোহান: (যমরাজকে দেখে) বাহবা, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি সত্যি আছো!
রাকেশ: (যমরাজের কাঁধে হাত রাখে। যমরাজ চমকে ওঠে। এর আগে এরকম করার স্পর্ধা কারো হয়নি) হে যমরাজ, কেমন আছো?
যমরাজ: (তার হাত সরিয়ে দিয়ে) আশা করি তোমরা জানো তোমরা কার সঙ্গে কথা বলছো! আমি যমরাজ। (সোজা হয়ে দাঁড়ায়) সারা পৃথিবী আমাকে ভয় পায়, বুঝতে পারছো?
শীলা: তাতে কী হয়েছে? আমি শীলা, মুম্বাইয়ের শীলা।
(ছেলেমেয়েরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে)
যমরাজ: এক্ষুনি থামো! আমি আওয়াজ ঘৃণা করি। বলো তোমাদের মধ্যে বিক্রম কে? সে এগিয়ে আসো। অনেক আগেই তার মরা উচিত ছিলো। আমরা তার মৃত্যুকে আর বিলম্বিত করতে পারি না। আমাদের সকলের উপর লক্ষ্য আছে। আমি শুধু বিক্রমকে চাই। (সবাই বিক্রমকে ধরে রাখে)
সাহেব: বিক্রমকে তোমার চাই, এর মানে কী? আমার একটা মার্সিডিজ বেঞ্জ দরকার। তার মানে কি আমি সেটা পাবো?
রোহান: একি জয়নগরের মোয়া নাকি, যে চাইলেই পাওয়া যাবে! একজন যা চায় তা সবসময় পায় না।
যশ: এবার তুমি যা চাও তা পাবে না। যদি তুমি বিক্রমকে চাও, তবে আমাদের সবাইকে চাইতে হবে।
শীলা: একটি কিনলে পাঁচটি ফ্রি! তোমার লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাবে। কেমন হবে?
সাহেব: যমরাজ, বিক্রমের ম্যালেরিয়া হয়েছে। এটি জীবন সংহারকারী রোগ নয়। তুমি সেটা জানো না? আর গালভরা বুলি ছেড়ে বলছো যে তুমি যমরাজ। (সাহেব হাসে, যমরাজ তার কথা শুনে ব্যথা পায়)
কোরাস: যমরাজের পতন হোক! পতন হোক, পতন হোক! মানছি না, মানব না।
যমরাজ: শান্ত হও! আমি আওয়াজ সহ্য করতে পারি না। অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। (যমদূতকে লক্ষ করে) এতোগুলো বাচ্চা কোথা থেকে নিয়ে এসেছো? আমি তোমাকে একজনকে আনতে বলেছি, আর তুমি পুরো ক্রিকেট দল নিয়ে হাজির!
যমদূত: যমরাজ, যেইনা আমি বিক্রমের ঘরে তাকে আনতে গিয়েছি, এই ছেলেমেয়েগুলো এসে বাগড়া দিয়েছে। তারা নাছোড়বান্দা, আমার সঙ্গে আসবেই। যখন বললাম, আমি শুধু বিক্রমকে চাই, তারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মারধর করেছে। আমার গালদুটো দেখুন, কেমন লাল। তারা বিক্রমকে কিছুতেই একা ছাড়বে না। (যমরাজ বিক্রমকে তার নিজের দিকে টানছে, আর ছেলেমেয়েরা তাকে নিজেদের দিকে টানছে)
(যমরাজ বিক্রমকে ছেড়ে দিয়ে)
যমরাজ: এই বাচ্চারা ভারত থেকে এসেছে, তাই বললে না?
যমদূত: হ্যাঁ মহারাজ। তারা কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আজকাল তার অনেক কাহিনি শোনা যায়। তারা একতাবদ্ধ এবং যে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে মরতে প্রস্তুত।
যমরাজ: কিন্তু আমি ন্যায়ের জন্য কোনো ছেলেমেয়েকে সোচ্চার হতে দেখিনি। এরা নিশ্চয়ই বিশেষ ধরনের।
যশ: অবশ্যই আমরা বিশেষ ধরনের। কাউকে তুলে আনার জন্য ভালো কোনো অজুহাত খুঁজে বের করো, যমরাজ!
সাহেব: না, আমরা কিছুতেই বিক্রমকে যেতে দেবো না। যদি তাকে চাও, তবে আমাদের সবাইকে নিতে হবে।
(তারা একসঙ্গে বলে ওঠে “মানছি না, মানব না”। যমদূত এবং প্রহরী বিমূঢ় হয়ে যায়। তারা জানে যমরাজ আওয়াজ ঘৃণা করে।)
যমরাজ: থামো, কতোবার তোমাদের বলবো যে আমি আওয়াজ ঘৃণা করি। দাঁড়াও, (সে তার ডাইরি নেয়) তোমাদের মতো বাচ্চা আমি এর আগে কখনো দেখিনি। একে অপরের প্রতি এতো অনুগত বাচ্চাও কখনো দেখিনি। ভারত থেকে আগত বাচ্চারা তোমাদের সকলকে শ্রদ্ধা জানাই। (কান্না শুরু করে, ছেলেমেয়েরা দেখে মজা পায়)
সাহেব: এ যমরাজ কাদছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
যমরাজ: (এখনো কান্নারত) আমার মত বদলানোর আগে চলে যাও, চলে যাও। তোমাদের বন্ধুকে নিয়ে যাও, সে ভালো হয়ে যাবে, সে ভালো হাতে আছে। তার সৌভাগ্য যে সে তোমাদের মতো বন্ধু পেয়েছে। চলে যাও!
(ছেলেমেয়েরা উল্লসিত। তারা জোরে চিৎকার করে- “যমরাজ দীর্ঘজীবি হোক”।)
যমরাজ: (দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে) আওয়াজ, এতো আওয়াজ! আমি আওয়াজ ঘৃণা করি। এখন বুঝতে পেরেছি। ভারত একটি আওয়াজে ভরা দেশ। স্বাভাবিকভাবে এই বাচ্চাগুলোর গলায়ও আওয়াজ বেশি। তাড়াতাড়ি সরে পড়ো, নইলে কিন্তু...
বিক্রম: (যমরাজকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে) ধন্যবাদ যমরাজ! অনেক ধন্যবাদ! আসলে তুমি অতো খারাপও নও! (যমরাজ এতোটা আহত বোধ করে যে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর অবস্থা থাকে না)
রাকেশ: চলো যাই। এখন সে জেনে গেছে আমাদের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়ে লাভ নেই।।
বিক্রম: ভুলে যাও, বন্ধুরা। মনে রেখো, শেষ ভালো যার সব ভালো তার। (তারা যেভাবে আওয়াজ করে এসেছিলো সেভাবে আওয়াজ করে বেরিয়ে যায়- “যমরাজ দীর্ঘজীবি হোক”। যমরাজ নিথর, প্রতিক্রিয়াহীন। যমদূত স্বস্তি পায়। যেইনা সে বেরুতে যাবে, অমনি যমরাজ তাকে ধরে।)
যমরাজ: তুমি কোথায় যাচ্ছো? তুমি কি ঠিকভাবে কিছু করতে পারো না? সবকিছু গোলমাল করে ফেলেছো। এখন তোমাকে ওভারটাইম কাজ করতে হবে। আবার ভারতে ফিরে যাও।
যমদূত: না, সেখানে আর নয়! (দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে, ধরা পড়ে, মার খায়)
যমরাজ: তুমি ভারতে যাবে এবং সেখানে অতিরিক্ত কাজের জন্য কোনো টাকা পাবে না। বুঝলে?
যমদূত: হ্যাঁ, মহারাজ! আপনি যা বলেন আমি তাই করবো। দয়া করে আমাকে আর মারবেন না। আমার গালের দিকে তাকান। আপেলের মতো লাল! (কান্না সুরে) তো বন্ধুরা এর থেকে শিক্ষা নাও যে “একতাই বল”।
-সমাপ্ত-

إرسال تعليق